ইউক্রেনের ওডেসাতে গত আগস্ট মাসে রুশ বিমান হামলায় ইউনেস্কো স্বীকৃত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে উনিশ শতকের বিখ্যাত আলেকজান্দ্রু স্টুরজা হাউসও রয়েছে। শুধু ওডেসাই নয়, ইউক্রেনের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে দেশটিতে ১৪৮টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধের দামামায় এ ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ কেন থামানো যাচ্ছে না এবং কেন অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠছে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষা ও দায়বদ্ধতা
এন্ডেঞ্জারড আর্কিওলজি ইন দ্য মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ গবেষক বিজান রুহানি জানান, কাগজে-কলমে আন্তর্জাতিক আইন শক্তিশালী হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ খুবই সীমিত। তিনি বলেন, এখন প্রমাণের অভাব নেই, কারণ আমাদের কাছে স্যাটেলাইট ইমেজ এবং পর্যবেক্ষণের প্রযুক্তি রয়েছে। কিন্তু মূল বাধা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বিচারিক এখতিয়ারের অভাব। এর আগে মালির টিম্বাকটুর ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংসের দায়ে আহমাদ আল-ফাকি আল-মাহদি নামে এক জঙ্গিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) সাজা দেওয়া হয়েছিল, যা এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে একমাত্র সফল বিচার।
গাজা ও অন্যান্য যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল
গাজার ঐতিহাসিক গ্রেট ওমারি মসজিদ ২০২৩ সালে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, গাজার দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতীক ছিল। গাজায় যুদ্ধের কারণে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারানোর পাশাপাশি প্রায় দুই লাখ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। সুদানের প্রাচীন মেরো পিরামিড এবং ইরানের ইউনেস্কো তালিকাভুক্ত গোলেস্তান প্যালেসও একই ধরণের সংকটের মুখে পড়েছে।
সুরক্ষায় স্থানীয় প্রচেষ্টা
সরকারি বা আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ধীরগতিসম্পন্ন হলেও, বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের উদ্যোগে সংস্কৃতি রক্ষায় কাজ করছে। আলিপ ফাউন্ডেশন ইউক্রেনের জাদুঘর থেকে মূল্যবান নিদর্শন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ব্লু শিল্ড ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সংস্থা যুদ্ধক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক স্থাপনা সুরক্ষায় রেড ক্রসের মতো কাজ করছে। এর বাইরে ইরাকের মসুলে লাইব্রেরির বই বাঁচাতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও ইতিহাস হয়ে আছে।
ভবিষ্যৎ ও দায়বদ্ধতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কঠোর আইন দিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানো সম্ভব নয়। commanders বা সামরিক কমান্ডারদের চিহ্নিত করা, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো পদক্ষেপ প্রয়োজন। যদি দায়ীদের শাস্তির মুখোমুখি না করা হয়, তবে যুদ্ধের মাঠে কেবল মানুষের প্রাণই নয়, মানব সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসও চিরতরে হারিয়ে যাবে।