ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানের সময় সেখানে কর্মরত সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ যখন যুদ্ধাপরাধের প্রমাণগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরছেন, তখন সেগুলোকে আড়াল করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো পরিকল্পিতভাবে সেন্সরশিপ আরোপ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলছেন, মেটাসহ বড় প্ল্যাটফর্মগুলো যুদ্ধের সহিংসতা বা উস্কানির অজুহাতে ফিলিস্তিনিদের পোস্ট সরিয়ে দিচ্ছে অথবা সেগুলোর প্রচার কমিয়ে দিচ্ছে।
এই প্রক্রিয়াকে বিশেষজ্ঞরা ‘ইকোসাইড’ বা প্রতিধ্বনি বিলুপ্তি হিসেবে বর্ণনা করছেন। এর মাধ্যমে পোস্ট পুরোপুরি মুছে না ফেললেও সেগুলোর রিচ বা দর্শক সংখ্যা এমনভাবে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, সত্যের আওয়াজটি আর জোরালোভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। এতে ফিলিস্তিনিদের যন্ত্রণার দলিলগুলো বিশ্বজনীন স্মৃতি বা গণমাধ্যম থেকে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
সাংবাদিক আহমেদ শিহাব-এলদিন জানান, তিনি যখনই গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অপরাধের দৃশ্যগুলো পোস্ট করেছেন, তখনই তার প্রোফাইলকে বারবার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এমনকি তার বহু পোস্ট আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গণহত্যার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পরেও মেটা তার অ্যাকাউন্টের রিচ কমিয়ে দিয়েছে। লেলা ওয়ারা নামক অপর এক সাংবাদিকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিধিনিষেধের ঘটনা ঘটেছে।
ডিজিটাল রাইটস কর্মী জিলিয়ান ইয়র্ক মনে করেন, আলগরিদমের মাধ্যমে এই সেন্সরশিপ এতটাই সূক্ষ্ম যে তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজে ধরা পড়ে না। এটি ইচ্ছাকৃত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠস্বর যে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার, তা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলছে।
মেটা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের মুখপাত্র জানিয়েছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা লঙ্ঘনের কারণেই নির্দিষ্ট কনটেন্টগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মেটা দাবি করেছে, তারা পদ্ধতিগতভাবে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে নীরব করার চেষ্টা করছে না এবং ভুলত্রুটি সংশোধনের জন্য তারা কাজ করছে।
তবে অ্যাকসেস নাও-এর পলিসি ডিরেক্টর মারওয়া ফাতফতা বলছেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং একটি কাঠামোগত সমস্যা। তার মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো বোতাম চেপে সেন্সরশিপ আরোপ করতে হয় না, বরং প্ল্যাটফর্মের ডিজাইন ও অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা অনেক ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের কথা বলার সুযোগকে সংকুচিত করে দেয়।
গাজার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা নৃবিজ্ঞানী রেবেকা এল স্টেইন মনে করেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ফিলিস্তিনিদের আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তার বয়ানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের আর্তনাদ রাজনৈতিক আলোচনার মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। গাজার সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, তারা কেবল টিকে থাকার লড়াই করছেন না, বরং ইতিহাসের পাতায় তাদের সত্য বয়ানটি তুলে ধরার জন্য ডিজিটাল সেন্সরশিপের এই প্রতিকূলতাকে জয় করার সংগ্রাম করছেন।