ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজসহ সমাজতান্ত্রিক নেতাদের বিশাল সব ম্যুরাল ও বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলার হিড়িক পড়েছে। শহরের কেন্দ্রস্থলে এক সময় যেখানে শাভেজ ও সাইমন বলিভারের প্রতিকৃতি শোভা পেত, সেখানে এখন ‘ভেনেজুয়েলা রিবর্ন’ লেখা নীল ব্যানার ঝোলানো হয়েছে। এই পরিবর্তন কি ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ধারায় বড় কোনো পালাবদল, নাকি কেবল পুরনো ভাবমূর্তিকে নতুন মোড়কে উপস্থাপনের চেষ্টা, তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সরকার বর্তমানে ‘ভেনেজুয়েলা রিবর্ন’ বা পুনর্জন্মের ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে। গত ২৪ জুন ভয়াবহ ভূমিকম্পে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর পর সরকারি ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে তারা এই উদ্যোগ নেয়। তবে সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তন কেবল দৃশ্যমান পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যার মূল লক্ষ্য বর্তমান সরকারের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি করা।
কারাকাসের শিল্পী ভিক্টর রদ্রিগেজ, যিনি ‘ফোরাস্তোরো’ নামে পরিচিত, শাভেজের ম্যুরাল সরানোর বিষয়ে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার দেয়ালে শাভেজের ছবি মুছে ফেলা মানে বিপ্লবের ইতিহাসকে আড়াল করা। তার মতে, বর্তমান সরকার মার্কিন চাপের মুখে তাদের আগের আদর্শ থেকে সরে আসছে এবং আমেরিকার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নতুনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অরল্যান্ডো পেরেজ বলেন, রদ্রিগেজ সরকার নিজেদের শাভেজ বা মাদুরোর উত্তরাধিকার থেকে আলাদা করতে চাইছে। তবে এই পরিবর্তন নিয়ে খোদ চ্যাভিস্তা (শাভেজ অনুসারী) শিবিরের মধ্যেই বিভক্তি দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, এই ম্যুরাল অপসারণ কেবল সরকারি রদবদল নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা।
এদিকে সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছে, ম্যুরাল মুছে ফেলা কোনো বড় বিষয় নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের সংকটের সমাধান দরকার। মুদ্রাস্ফীতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও খাদ্যমূল্য বৃদ্ধিতে দিশেহারা মানুষ সরকার পরিবর্তনের চেয়ে জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, শাভেজ ও মাদুরোর ছবি সরানো তাদের কাছে এক ধরনের স্বস্তি। তবে সরকারের দেয়া নতুন প্রতিশ্রুতিগুলো যে লা গুয়াইরার মতো দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের দুঃখ ঘোচাতে পারছে না, তাও উঠে আসছে আলোচনায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার এই নতুন রূপান্তরের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব রয়েছে। দেশটির জ্বালানি খাতে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে তারা গভীর উদ্বেগের জায়গা হিসেবে দেখছেন। সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলার দেয়ালে দেয়ালে এই পরিবর্তনের চিত্র এখন কেবল শিল্পের লড়াই নয়, বরং দেশটির আগামীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের এক জটিল সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।