নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ১৩০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি দেশটির জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা চরম সংকটে পড়েছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির মুখপাত্র রাজন ঢাকাল জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর দেশটির জলবিদ্যুৎ নীতি পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দেশের বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় শতভাগ পূরণ করে এবং ভারত ও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। তবে গত সপ্তাহের বন্যায় ত্রিশুলি নদী অববাহিকার ১২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা দেশের মোট উৎপাদন ক্ষমতার ১০ শতাংশেরও বেশি।
জলবিদ্যুৎ নির্ভরতার ঝুঁকি
২০১০ সাল পর্যন্ত নেপালে বিদ্যুৎ সংকট ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। পরবর্তীতে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে সেখানে ২২৫টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। তবে বেশিরভাগ কেন্দ্র পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় গ্লেসিয়ার বা হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় হিমালয়ের উচ্চতা এলাকায় উষ্ণতা ৫০ শতাংশ দ্রুত বাড়ছে, যা অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালকে কেবল জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভর না করে সৌর এবং বায়ু বিদ্যুতের মতো বিকল্প উৎসগুলোতে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
পুনর্বিবেচনার তাগিদ
সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী কুলমান ঘিসিংশ জানিয়েছেন, দুর্যোগ সহনশীল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এবং কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া বর্তমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে জরুরি evacuation বা উদ্ধার পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রকৌশলগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যদিও কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, নেপালের ভূ-প্রকৃতি জলবিদ্যুতের জন্য সবচেয়ে উপযোগী, তবুও ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা
তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। দক্ষিণ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভারস অ্যান্ড পিপল-এর সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাক্করের অভিযোগ, এসব প্রকল্পের ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। অন্যদিকে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন দাবি করেছে, তারা প্রকল্প ডিজাইনের ক্ষেত্রে গ্লেসিয়ার ও বন্যার ঝুঁকি বিবেচনা করেছিল। তবে সাম্প্রতিক বিপর্যয় এই খাতের বিমা প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ব্যবসায়িক পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তুলছে। নেপালের জলবায়ু বিষয়ক প্রতিনিধি মনজিৎ ঢাকাল মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় কেবল নেপাল নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ ও তথ্য বিনিময় প্রয়োজন।