সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ইউনিভার্সিটি অব জুরিখের গবেষকরা স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কে হওয়া ক্ষতি সারিয়ে তোলার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। ইঁদুরের ওপর করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্কের টিস্যু নতুন করে তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নতুন নিউরন সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রাণীদের হারিয়ে যাওয়া শারীরিক চলাচলের ক্ষমতা ফিরে এসেছে। এই চিকিৎসা পদ্ধতি মস্তিষ্কের রক্তনালী এবং প্রদাহজনিত সমস্যার উন্নতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
স্ট্রোকের ভয়াবহতা ও স্থায়ী ক্ষতি
বিশ্বজুড়ে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্ট্রোক অত্যন্ত সাধারণ একটি শারীরিক সমস্যা। স্ট্রোকের শিকার প্রায় অর্ধেক মানুষের মধ্যেই কথা বলা বা শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যাওয়ার মতো স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা থেকে যায়। মস্তিষ্কের কোষগুলো একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা আর প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় না, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিভার্সিটি অব জুরিখের নিউরোডিজেনারেশন গ্রুপের বৈজ্ঞানিক প্রধান ক্রিশ্চিয়ান ট্যাকেলবার্গ জানান, এই স্থায়ী ক্ষতি সারিয়ে তুলতে নতুন থেরাপিউটিক পদ্ধতির গুরুত্ব অপরিসীম।
মস্তিষ্কের টিস্যু পুনর্গঠন
গবেষক দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ক্রিশ্চিয়ান ট্যাকেলবার্গ ও রেবেকা ওয়েবার। তারা ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে এই পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। গবেষণায় দেখা যায়, স্টেম সেল কেবল নষ্ট হয়ে যাওয়া নিউরনের শূন্যস্থান পূরণ করে না, বরং এটি মস্তিষ্কের সামগ্রিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। গবেষকরা মানুষের স্টেম সেল ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রয়োগ করেন এবং পাঁচ সপ্তাহ ধরে তা পর্যবেক্ষণ করেন। এতে দেখা যায়, প্রতিস্থাপিত কোষগুলো নতুন নিউরনে রূপান্তরিত হয়ে বিদ্যমান মস্তিষ্কের কোষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও কার্যকারিতা
এই গবেষণায় নতুন রক্তনালী তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মস্তিষ্কের সুরক্ষা স্তর বা ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ারের কার্যকারিতা উন্নত হতে দেখা গেছে। স্ট্রোকের এক সপ্তাহ পর স্টেম সেল প্রয়োগ করলে এর ফলাফল সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, এই সময়সীমা চিকিৎসা প্রস্তুতির জন্য চিকিৎসকদের বাড়তি সুবিধা দেবে। এআই-এর সহায়তায় ইঁদুরের হাঁটার গতিবিধি বিশ্লেষণ করে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই থেরাপিতে শারীরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে ফিরে এসেছে।
ভবিষ্যৎ করণীয়
গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, মানুষের শরীরে এই পদ্ধতি প্রয়োগের আগে আরও কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি রোধ করা। এজন্য তারা একটি বিশেষ ‘সেফটি সুইচ’ তৈরির কাজ করছেন। এছাড়া মস্তিষ্ক উন্মুক্ত না করে রক্তনালীর মাধ্যমে কোষ পৌঁছানোর উপায় নিয়েও গবেষণা চলছে। জাপানে পারকিনসন রোগের চিকিৎসায় স্টেম সেলের ব্যবহার শুরু হওয়ায় গবেষকরা আশাবাদী যে, অদূর ভবিষ্যতে স্ট্রোকের চিকিৎসাতেও এই পদ্ধতি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর্যায়ে পৌঁছাবে।