সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের তৎপরতা আবারও আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অঞ্চলটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। সোমালিয়ার ফেডারেল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ আগস্ট তুরস্কের নৌবাহিনী এবং সোমালি বাহিনীর যৌথ অভিযানে ১০ দিন ধাওয়া করার পর ‘এমভি লুতুফ’ নামের একটি কার্গো জাহাজ মুক্ত করা হয়েছে। এই অভিযানে ১৪ জন জলদস্যু নিহত এবং তাদের চারটি নৌকা ধ্বংস করা হয়েছে।
সোমালিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তুরস্কের সাথে ২০২৪ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। যদিও পুন্টল্যান্ড অঞ্চলের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় এই দাবি অস্বীকার করেছে। তাদের অভিযোগ, কোনো সামরিক উদ্ধার অভিযান নয়, বরং দস্যুদের মুক্তিপণ দিয়েই জাহাজটি ছাড়িয়ে আনা হয়েছে। তবে এই দুই ভিন্ন তথ্যের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জলদস্যুতার বর্তমান পরিস্থিতি
২০১১ সালে সোমালি জলদস্যুতার যে ভয়াবহতা দেখা গিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেই তুলনায় কম হলেও এটি গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৫টি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মে মাসের পর থেকে এডেন উপসাগরেই আটটি আক্রমণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার সমুদ্রসীমায় জলদস্যুতার ঝুঁকিকে ‘গুরুতর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কেন বাড়ছে জলদস্যুতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই বরং বেশ কিছু পরিস্থিতি একই সময়ে তৈরি হয়েছে। প্রথমত, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি পরিবর্তনের ফলে অনেক শক্তিশালী দেশের নৌবাহিনী সোমালি উপকূল থেকে তাদের টহল কমিয়ে অন্য এলাকায় মনোনিবেশ করেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জলদস্যুরা আক্রমণ বাড়াচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, সোমালিয়ায় অর্থনৈতিক সংকট, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং বিদেশি সহায়তায় কাটছাঁট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এছাড়া অবৈধ মৎস্য শিকারের কারণে স্থানীয় জেলেরা তাদের জীবিকা হারিয়ে অপরাধের দিকে ঝুঁকছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আর্থিক বিনিয়োগ ও অপরাধী চক্র
বর্তমানে সোমালি জলদস্যুতা কেবল স্থানীয় জেলেদের কাজ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে বড় বিনিয়োগকারী ও সুসংগঠিত অপরাধী চক্র। সোমালি ও ইয়েমেনের ব্যবসায়ীরা দস্যুদের স্যাটেলাইট ফোন, উন্নত নেভিগেশন সরঞ্জাম এবং অস্ত্র সরবরাহ করছে বলে তথ্য রয়েছে। মুক্তিপণের টাকার একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে এসব বিনিয়োগকারীদের পকেটে।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সোমালিয়াসহ আঞ্চলিক দেশগুলো গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ওপর জোর দিচ্ছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সৌদি আরবের নেতৃত্বে বিভিন্ন সামুদ্রিক টাস্কফোর্স সক্রিয় করা হয়েছে। তবে সোমালিয়ার সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষাবিদ আফয়ারে ইলমির মতে, কেবল নৌ-টহল দিয়ে জলদস্যুতা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য উপকূলীয় এলাকায় শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।